জীবনে সুখী হওয়ার উপায়

1

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি-

happy

মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের খেয়াল-খুশি, ইচ্ছা-আকাংখা বা কামনা-বাসনা বিসর্জন দেওয়া মুমিনদের জন্য সুখ ও সফলতার একটা মাধ্যম। মহান আল্লাহ তাআ’লা ইরশাদ করেছেন,

لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ

“তোমরা কস্মিণকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় না কর। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, আল্লাহ তা ভালো জানেন।” (সুরাহ আলে-ইমরান, আয়াত : ৯২)

নবী ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোন কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে তার চাইতে উত্তম কিছু দ্বারা প্রতিস্থাপন করবেন।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৫৬৫)

নবী ﷺ বলেছেন, “এই পৃথিবীর পুরোটাই হচ্ছে ভোগ-বিলাস ও আনন্দ উল্লাসের সামগ্রী। তার মাঝে সর্বোত্তম সম্পদ হচ্ছে নেক ও সৎকর্মপরায়ণ (উপযুক্ত) স্ত্রী।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪৬৭)

এজন্যই একজন আলেম বলেছেন –

“ঈমানের পর মুমিন বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচাইতে বড় নেয়ামত হচ্ছে অনুগতা, মিষ্ট ভাষী, কোমল হৃদয়ের মুমিনাহ স্ত্রী। আর শিরকের পরে বান্দার জন্য সবচাইতে বড় বিপদ হচ্ছে ধারালো জিহবার ও বদ চরিত্রের অবাধ্য স্ত্রী।”

একটি হৃদয় গলানো কাহিনীঃ

ক্বাজী আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী আল-বাজ্জাজ রহি’মাহুল্লাহ ইসলামী ইতিহাসে স্বনামধন্য একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর সময়ের সবচাইতে উত্তম এবং নেককার একজন বান্দা হিসবে বিবেচিত। তিনি ৫৩৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন, প্রায় নয়শ বছর পরেও আজ পর্যন্ত তিনি মুসলিমদের জন্য একজন অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহর রাস্তায় চলার জন্য উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হিসেবে সমাদৃত।

আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোন কিছু ত্যাগ করার অকল্পনীয় প্রতিদান নিয়ে ক্বাজী আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী রহি’মাহুল্লাহর জীবনের সুন্দর ও শিক্ষণীয় একটা ঘটনার মূলভাব সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।

ক্বাজী আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী বলেন – “পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ের দিকে আমার তরুণ বয়সে থাকা অবস্থায় আমি সম্মানিত মক্কা শহরে ক্বুরআন ও হাদীস শিখার জন্য ‘তালিবুল ইলম’ হিসেবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করি।

এমনি একসময়ে আমি কর্মহীন হয়ে পড়ি এবং আমার জমানো টাকা শেষ হয়ে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হই। টাকার অভাবে আমি পড়াশোনা বন্ধ করে দেই, এমনকি আমার কিছু বই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হই। মাঝে মধ্যে আমি ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটাতাম, কিন্তু আমার আত্মসম্মানের কারণে কারো কাছে ধার চাইতে বা ভিক্ষা করা থেকে আমি বিরত থাকি।

একদিন আমি ক্ষুধার্থ অবস্থাতে আমি কাবা ঘরে যাই, সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে দুয়া করার জন্য, তিনি যেন আমাকে এই কঠিন অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন। সেইদিন বাড়িতে ফেরার সময় মক্কার নগরীর একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ আমার চোখে পড়লো, রাস্তার মাঝে একটা ছোট্ট, সুন্দর রেশমের থলে পড়ে আছে। আশেপাশে আর কেউ নেই দেখে, সেজন্য আমি থলেটা উঠিয়ে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসলাম।

বাড়িতে ফিরে আমি সেই থলেটা খুলে দেখি সেখানে অত্যন্ত দামী মুক্তার একটি হার। হারটা এতো সুন্দর যে, আমার পুরো ঘর যেন আলোকিত হয়ে গেছে। এতো দামী হার দেখে মুহূর্তের মাঝে আমি আমার ক্ষুধা ও দুর্দশার কথা ভুল গেলাম। যাইহোক, আমার হারের মালিকের কথা মনে পড়লো। এতো দামী ও সুন্দর একটা হার হারিয়ে নিশ্চয়ই সে দুঃখ ও পেরেশানির মাঝে আছে।

সাথে সাথে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, হারের মালিককে তার কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমি তাকে খুঁজে বের করবো এবং তাকে তার হার ফেরত দিবো।

কুঁড়িয়ে পাওয়া হারের মালিকের খোঁজে আমি পূর্বের জায়গায় ফিরে আসি। এমন সময় সেখানে কয়েকজন যুবক ছেলেকে উত্তেজিত অবস্থায় জড়ো হয়ে কোন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে দেখি। আমি বুঝতে পারলাম, তাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছেঃ একটি হারিয়ে যাওয়া মুক্তার থলে।

সেখান একজন সম্মানিত, ধনী ও বয়ষ্ক লোক ঐ যুবক লোকদেরকে তার হারিয়ে যাওয়া হারের বর্ণনা এবং এনিয়ে তার দুঃখের কথা বর্ণনা করছিলেন। এমনকি তিনি তার হার খুঁজে পেতে যে সাহায্য করবে, তাকে তিনি ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা পুরষ্কার দিবেন বলে ঘোষণা করলেন।

যুবক আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী তার কাছে এগিয়ে গেলেন আর তাকে হারের ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলেন। বয়ষ্ক লোকটির বর্ণনা শুনেই তিনি বুঝতে পারলেন, তার কুড়িয়ে পাওয়া হারের মালিক আসলে এই ব্যক্তিটি। আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী লোকটির হাত ধরে বললেন, আপনি আমার সাথে আমার বাড়িতে চলুন।

লোকটি কোন প্রশ্ন না করে তার সাথে চলতে শুরু করলো। পথিমধ্যে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী চিন্তা করতে লাগলেন, এই মহৎ কাজের জন্য নিশ্চয় একটু পরেই লোকটি আমাকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিবে।

বাড়িতে আসার পরে লোকটি হারের হুবুহু বর্ণনা দিলো। আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী হারের আসল মালিক তিনি, এইকথা নিশ্চিত হয়ে লোকটিকে হার ফেরত দিলেন। অত্যন্ত মূল্যবান হার ফেরত পেয়ে লোকটি খুশি হয়ে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীকে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা উপহার হিসেবে দিতে চাইলেন।

কিন্তু আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী সেটা ফিরিয়ে দিলেন। আর বললেন,

“এই হারটা এমনিই আমার সামনে এসে পড়েছে, এর জন্য আমার কোন পরিশ্রম করতে হয়নি যে। সুতরাং, এই কাজের বিনিময়ে আমি কোন পুরষ্কার নিতে পারি না, কারণ এটা আমার পাওনা নয়। আপনার হার ফিরিয়ে দেওয়া যদি কোন ভালো কাজ হয়ে থাকে, আর এটা যদি আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করি, তাহলে আপনার দেওয়া পুরষ্কারের চাইতে আমি আল্লাহর কাছেই এই কাজের জন্য পুরষ্কার আশা করি।”

লোকটি অনিচ্ছা সও্বেও কোন পুরষ্কার না দিয়েই আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর কাছ থেকে হার ফেরত নিয়ে চলে গেলেন।

এই ঘটনার এক সপ্তাহ পর আমি আমার চাকরী ফিরে ফেলাম। পরবর্তীতে আমি আমার উস্তাদের সুপারিশক্রমে স্পেনের রাজধানী কুরতুবাতে ‘কাজী’ (বিচারক বা মুফতি) হিসেবে দায়িত্ব পাই। কুরতুবা যাওয়ার জন্য আমি আমার সংগীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জেদ্দা বন্দর থেকে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে চড়ে রওয়ানা হই। তাকদীরের এমনই লিখন, সেই জাহাজ পড়লো ঝড়ের কবলে। পুরো জাহাজ ভেঙে লণ্ডভণ্ড হয় গেলো। হাতের কাছে যে যা পেলো ওটা ধরেই ভেসে রইলো।

আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী দুই দিন ধরে সমুদ্রের পানিতে ভাসতে ভাসতে একটা দ্বীপে গিয়ে উঠলেন। দ্বীপে উঠে তার কিনারায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলেন। জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি অপচিরিত কিছু মুখ দেখলেন, যারা তাকে বহন করে কাছের একটা শহরে নিয়ে আসলো। আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী দ্বীপে একটি মসজিদের মিনার দেখে বুঝতে পারলেন, এটা মুসলিমদের বাসস্থান।

তিনি মুসলিমদের পেয়ে খুব খুশি হলেন। স্থানীয় লোকেরা তাঁকে সেবা-শুশ্রুষা করে সুস্থ করে তুললো। সেখানে ফালাহ হাসান নামে একজন দয়ালু ব্যক্তি তাঁর নিজের বাড়িতে থাকার জন্য আশ্রয় দিলেন। সেখান থেকে তিনি জানতে পারলেন, তিনি ইয়েমেনের সমুদ্র উপকূলর্তী হুদাইদা নামক একটা দ্বীপে আশ্রয় পেয়েছেন।

আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী স্থানীয় মসজিদে নামায পড়ার জন্য যাওয়া-আসা শুরু করলেন। মসজিদের সম্মানিত বয়ষ্ক ব্যক্তিদের সাথে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর সুসম্পর্ক গড়ে উঠলো। তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন শায়খ আহমাদ বিন সুহাইল, যিনি সাধারণত নামাযের ইমামতি করতেন। একদিন শায়খ আহমাদ আসতে দেরী হলে লোকজন তাঁকে নামায পড়ানোর জন্য অনুরোধ করলো।

তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও নামায পড়ালেন। নামাযে তিনি খুব সুন্দর ক্বুরআন তিলাওয়াত করলেন এবং নামাযের পর ইসলামি হুকুম-আহকাম নিয়ে ছোট্ট একটা ‘বয়ান’ দিলেন। লোকেরা তাঁর এই কাজে খুব খুশি হলেন এবং শায়খ আহমাদ তাঁকে অনেক ধন্যবাদ ও উৎসাহ দিলেন। আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী সেইদিন খুশিমনে বাড়ি ফিরে আসলেন।

কিন্তু বাড়ি ফিরে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী ভাবলেন, তাঁকে আশ্রয় দানকারী ব্যক্তিকে তাঁর বোঝা থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত। তিনি তাঁর ইচ্ছার কথা ফালাহ হাসানের কাছে ব্যক্ত করলেন। কিন্তু ফালাহ হাসান তাঁর এই কথা মেনে নিলেন না। যাই হোক, কৃতজ্ঞতাবশত আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী তাঁকে আশ্রয় দানকারী ব্যক্তির কথা অমান্য করলেন না।

সেই দিন রাতে ফালাহ হাসান, শায়খ আহমাদ বিন সুহাইল সহ আরো কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে নিয়ে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর কাছে উপস্থিত হলেন। শায়খ আহমাদ বললেন, “প্রিয় আবু বকর, তুমি অনুমতি দিলে সবার পক্ষ থেকে আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।” তিনি বললেন, “আপনারা আমার প্রতি অত্যন্ত দয়া করেছেন ও ভালোবাসা দিয়েছেন। আপনারা আমাকে আদেশ করুন।”

শায়খ আহমাদ বললেন, “আমাদের মসজিদের নিয়মিত ইমাম গত বছর মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে খুব ভালোবাসতেন, আমাদেরকে সাহায্য করতেন, আমাদের ও আমাদের সন্তানদেরকে দ্বীন শিখাতেন। তাঁর মৃত্যুর পরে আমরা তাঁকে ভুলতে পারছিনা এবং বাকি জীবনে ভুলতে পারবো বলে মনে হয়না। আমরা ইমাম হওয়ার মতো যোগ্য কোন ব্যক্তিকে পাচ্ছিনা।

আমরা তোমাকে অনুরোধ করছি, তুমি আমাদের এখানে চিরদিনের জন্য থেকে যাও এবং আমাদের ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করো। আমরা হয়তো কুরতুবাতে তোমার কাজীর পদের মতো খুব বেশি বেতন দিতে পারবোনা। কিন্তু আমরা তোমাকে অনেক ভালোবাসবো ও তোমাকে সম্মান দিয়ে রাখবো।”

আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী আপত্তি করে বললেন, “ইমামের মতো মহান কাজের জন্য যথেষ্ঠ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আমার নাই।” শায়খ আহমাদ বললেন, “বৎস! নিজেকে ছোট করোনা। আমরা তোমার ক্বুরআন তিলাওয়াত ও বয়ান শুনেছি, আমরা মনে করি তুমি এই কাজের জন্য অবশ্যই যোগ্য।”

উপস্থিত ফালাহ হাসান এবং অন্যান্যরা এই প্রস্তাবে এতো বেশি জোর দিয়ে সমর্থন করলেন যে, আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর আপত্তি করার কোন সুযোগ থাকলোনা এবং তিনি রাজী হলেন। সবাই খুব খুশি হলো। শায়খ আহমাদ তাঁকে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাঁর মাথায় চুমু খেলেন।

নতুন জায়গা, নতুন দায়িত্বে তিনি খুব সুন্দরভাবে মানিয়ে নিলেন। আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীকে সবাই একজন ‘ইমাম’ (ধর্মীয় নেতা) হিসেবে সম্মান করতো। এই প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য তিনি খুব সন্তুষ্ট হলেন এবং জীবনে আর কোনদিন এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে আফসোস করতে হয়নি। কিছুদিন পরে শায়খ আহমাদ আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর কাছে এসে বললেন, “বৎস আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।” তিনি বললেন, “আপনি আমাকে আদেশ করুন।”

শায়খ আহমাদ বললেন, “সংগী ছাড়া মানুষের জীবন অসম্পূর্ণ। আমি চাই তুমি বিয়ে করো এবং বিয়ের বরকত গ্রহণ করো। এছাড়া এটা ইসলামের মহান একটি আদেশ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের একটি সুন্নত। আমাদের মসজিদের প্রাক্তন ইমাম একটি মেয়ে রেখে মৃত্যুবরণ করেন।

মেয়েটি বাবা আমার বন্ধু ছিলো, সেইজন্য তাঁর মৃত্যুর পরে আমি তাঁর মেয়ের গার্জিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সেই মেয়েটি সর্বগুণে গুণান্বিতা, যেমন সুন্দরী তেমনি বুদ্ধিমতী। আমি মনে করি, সে তোমার জন্য উপযুক্ত। তুমি কি তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে?”

আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী মেয়েটিকে না দেখেই বললেন, “আমার কোনও আপত্তি নেই।” এরপর একটা দিন ধার্য করে তাদের বিয়ে হয়ে গেলো। ওয়ালীমার পরে শায়খ আহমাদ মেয়েটিকে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর কাছে অর্পণ করলো, সেই ইমামের বাড়িতে, যেখানে মেয়েটি বসবাস করছিলো।

বাসর রাতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী অবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। আসলে তিনি মেয়েটির সৌন্দর্য নয়, বরং তার গলার হার দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে থমকে যান।

শায়খ আহমাদ এই অবস্থা দেখে বললেন, “আবু বকর এই গলার হার এবং তার মালিকা, এখন থেকে দুটোই তোমার। এই গলার হারের একটা ইতিহাস আছে। এই মেয়েটির বাবা হজ্জের সময় সাথে করে এই হারটিকে নিয়ে যান, হারটি পরিষ্কার করে চকচকে করানোর জন্য। কিন্তু তিনি মক্কাতে হারটি হারিয়ে ফেলেন।

মক্কার একজন যুবক যে কিনা অত্যন্ত সৎ ও ধার্মিক, সে তাঁকে হারটি অক্ষত অবস্থায় খুঁজে পেতে সাহায্য করেন। সেই যুবকটি এতো সৎ যে, সে এর বিনিময়ে কোন পুরষ্কার নিতে রাজি হয়নি। আমার বন্ধু হজ্জ থেকে ফেরত এসে সেই যুবকের খুব প্রশংসা করতেন।

এমনকি তিনি আমার কাছে এটাও বলেছিলেন যে, আরেকবার মক্কাতে গিয়ে তিনি সেই যুবক ছেলেটিকে খুঁজে বের করবেন এবং তার এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে প্রস্তাব দিবেন।”

পুরো ঘটনা শুনে আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর অন্তরে আবেগের ঝড় বয়ে গেলো। তিনি আনন্দিত হয়ে বললেন, “তাক্বদীরের গোপন রহস্য কেউ জানেনা। আমি-ই সেই যুবক যে কিনা আপনার বন্ধুর হার খুঁজে পেয়ে ফেরত দিয়েছিলাম। তিনি আমাকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি সেটা নিতে অস্বীকৃতি জানাই।”

শায়খ আহমাদ পুরো ঘটনা শুনে খুব খুশি হলেন এবং অত্যন্ত আবেগে আপ্লুত হয়ে কোন কথাই বলতে পারলেন না, শুধু তাঁর হাত ধরে থাকলেন। আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বীর নবপরিণীতা স্ত্রী ভালোবাসা ও আবেগের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলো, সে যত উত্তম স্বামী মনে মনে আশা করতো, তার চাইতে উত্তম স্বামী সে পেয়ে গেলো।

আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী বলেন, “সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে একজন যোগ্য, নেককার এবং প্রেমময়ী স্ত্রী দান করেছেন, এমন স্ত্রী আল্লাহর দেওয়া সমস্ত নেয়ামত সমূহের মাঝে শ্রেষ্ঠ।”

এই কাহিনী থেকে শিক্ষাঃ

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন কিছু ত্যাগ করা কিংবা বর্জন করার জন্য আল্লাহ তার চাইতে উত্তম কোন কিছু দ্বারা ফিরিয়ে দিবেন, হয় শীঘ্রই নয়তো একটু দেরীতে, এই দুনিয়ার জীবনে, নয়তো আখিরাতে।

নেককার, যোগ্য ও প্রেমময়ী জীবন সংগিনী এই দুনিয়াতে পুরুষদের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যা আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী রহি’মাহুল্লাহর কথা থেকে প্রমানিত হয়। তিনি বলেছেন, “সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে একজন যোগ্য, নেককার এবং প্রেমময়ী স্ত্রী দান করেছেন, এমন স্ত্রী আল্লাহর দেওয়া সমস্ত নেয়ামত সমূহের মাঝে শ্রেষ্ঠ।

সুতরাং, মুমিনদের উচিত নেককার স্বামী অথবা স্ত্রী পাওয়ার জন্য সবসময় আল্লাহর কাছে দুয়া করা, এবং শরিয়ত সম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করে তার জন্য সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা। সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ, দুনিয়াবী শিক্ষার চাইতে সর্বাবস্থায় দ্বীনদার পাত্র/পাত্রীকে প্রাধান্য দেওয়া।

উৎস এবং কৃতজ্ঞতাঃ

ক্বাজী আবু বকর মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল-বাক্বী রহি’মাহুল্লাহর অনন্য এই ঘটনাটি আল-হা’ফিজ ইবনে রজব রহি’মাহুল্লাহ তাঁর ‘তাবাক্বাত আল-হানাবিলা’ নামক গ্রন্থের (প্রথম খন্ড, ১৯৬ পৃষ্ঠায়) এবং অন্যান্য মুসলিম ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন।

লেখাটা মূলত ডা. সালেহ আস-সালেহ রহি’মাহুল্লাহর একটা লেকচারের মূলভাব আমি অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। তাঁর লেকচারের অডিও লিঙ্ক এবং লেকচারের ট্রান্সক্রিপ্ট আপনারা এই লিংকে পাবেন – https://bit.ly/2RBQPp7

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Donate

1 মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.