কথার কথা নয়, কথার অলংকার

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি-

Taking

লেখা : ইসমত কনক

পৃথিবীতে মানুষ যতই বলুক কথার চেয়ে কাজের গুরুত্ব বেশি। কিন্তু সেটা মনে হয় অনেক ক্ষেত্রে বইপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর বাঙালী! সে – তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু কথা আর কথা। কোন একটা টপিক পেলেই হলো। গসিপ বা ট্রল করা শুরু। মূল্যবান সময় গুলোর কত যে অপচয় হচ্ছে! গুনাহর পাল্লা কতটা ভারী হচ্ছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই।

কোন কথা বলে কাকে সাময়িক খুশি করা যায়, কি বলে কারো মনে আঘাত দেয়া যায়, কার কি হয়েছে, কোনটা করলে কি হতে পারে, কি হতে পারতো বেশির ভাগ সময় এসব অহেতুক কথাতেই ব্যস্ত থাকে। যতসব অপ্রয়োজনীয় কথা, পরনিন্দা, গীবত। অথচ – প্রতিটি কথাই রেকর্ড হচ্ছে, কি বলা হচ্ছে, ভালো না মন্দ। কথার মাধ্যমে আমলনামার পূণ্য শূণ্য হয়ে যেতে পারে; আবার এই কথার মাধ্যমেই আমলনামায় অনেক সওয়াব জমা হতে পারে।

কাউকে ভাল কথা বলা একটি সাদাকা, একটি উত্তম গুণ। অনেকে দেখা যায় কাউকে খোঁচা দিয়ে কথা বলে তৃপ্তি পায় ; যেখানে কোন মুসলিমের সাথে হাসিমুখে কথা বলাটা ও সাদাকা। অথচ – আমরা যদি আমরা দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ প্রয়োজনীয় কথাগুলোতে অল্প কিছু শব্দ যোগ করি সেই শব্দটিই হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য পরম সওয়াবের মাধ্যম। কথার ও সৌন্দর্য বাড়লো আর সওয়াবের খাতায়ও সওয়াব জমা হলো। একসাথে দুই কাজ। জীবন পথে চলতে আমরা কত কি-ই না বলে থাকি। ভালো-মন্দ সব কিছুই উচ্চারিত হয় আমাদের মুখে। সময় অনুসারে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণেই আমরা কিভাবে প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ এর সুন্নাত আদায় করতে পারি এবং কথাটা সওয়াবের উপায় করতে পারি তার কয়েকটি বলছি,

কোন কাজ শুরু করার সময় ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে শুরু করা সুন্নত। (১) বিসমিল্লাহ্ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করলে কাজটি সুষ্ঠু ভাবে সম্পাদনের আশা করা যায়। এছাড়া কাজের সময়টা ইবাদতে গন্য হবে ইন শা আল্লাহ্।

কিছু খাওয়া বা পান করার সময়, কোন কিছু লেখা বা পড়ার সময় তাই অবশ্যই বিসমিল্লাহ্ বলতে হবে। ‘বিসমিল্লাহ্’ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি’ বলে শুরু না করলে কোন কিছুতে বারাকাহ্ পাওয়া যায় না। আর খাওয়ার সময় শয়তান ও অংশীদার হয়।

কিছু খাওয়া বা পান করা শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ‘ বলতে হয়। আবার কোন শুভ সংবাদ শোনা হলে ও তদ্রুপ “আলহামদুলিল্লাহ” অর্থ্যাৎ ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’ – বলতে হবে।

কারো সাথে দেখা হলে হাই বা হ্যালো না বলে আস্ সালামু আলাইকুম বলতে হবে পরিপূর্ণ ভাবে। অর্থ্যাৎ – ‘আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক’। (সূরাহ আন-নূর)

এ ব্যাপারটা এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। চেনাজানা বা আপনজন ছাড়া কেউ এখন যেন আর সালাম দিতে চায় না। অথচ পরিচিত, অপরিচিত সবাইকে সালাম দেয়ার জন্য নির্দেশ আছে।

কোন অমুসলিম সালাম দিলে শুধুমাত্র ‘ওয়া আলাইকুম’ বলে জবাব দিতে হবে।

কেউ ‘কেমন আছো’ বলে কুশল জিজ্ঞেস করলে তার জবাবে ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। (২) এই বাক্যটি একটি যিকির, সাদাকা ও সবচেয়ে উত্তম দুআ। (৩) সুখে-দুঃখে, স্বচ্ছল-অস্বচ্ছল সর্বাবস্থায় শুকরিয়া আদায়কারী ব্যক্তিই আসলে আল্লাহর প্রকৃত কৃতজ্ঞ বান্দা।

যদি সে মূহুর্তে সে শারীরিক ও মানসিক ভাবে ভালো না ও থাকেন, তাহলে ‘ভালো লাগে না’ না বলে বলতে হবে ‘আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল।’

অর্থাৎ ‘যেকোন অবস্থাতেই আল্লাহর প্রশংসা।‘ (৪) রাসূল ﷺ এর সামনে কোন অপ্রীতিকর জিনিস এলে তিনি এটা বলতেন।

আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ব বা বড়ত্বের কোনো কৃতিত্ব দেখলে কিংবা শুনলে ‘সুপার’ না বলে ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহ মহান’ বলা সুন্নত। (৫) 

স্বাভাবিকের মধ্যে কোনো ব্যতিক্রম দেখলে কিংবা আশ্চর্য ধরনের কোন কথা শুনলে ‘ওয়াও’ না বলে ‘সুবহানআল্লাহ্’ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহ্ পবিত্র-মহান’ বলতে হবে। (৬) এটি ও একটি যিকির ও সাদাকা।

যে কোন কিছু বেশি পছন্দনীয় হলে দেখলে ‘জোশ’ না বলে ‘মাশাআল্লাহ্’ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহ্ যেমন চেয়েছেন’ বলা সুন্নত। (৭) 

ভবিষ্যতে কোন কিছু করার ইচ্ছা করলে হোক সেটা কোন কাজ বা কোথাও যাওয়া; সেক্ষেত্রে ‘ইনশাআল্লাহ্’ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে’ বলতে হবে। (সূরাহ আল-কাহাফ, আয়াত : ২৩-২৪)

কারো হাঁচি এলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা সুন্নত। (৮) 

কোনো হাঁচি দাতা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতে শুনলে- ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ্’ বলা সুন্নত। (৯) 

কোনো বাজে কথা শুনলে বা কোন গুনাহ্ হতে দেখলে ‘শিট্’ না বলে ‘নাউযুবিল্লাহ্ অর্থ্যাৎ ‘আমরা এ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই’ বলতে হবে। (১০)

কোন বিপদের কথা শুনলে কিংবা কোনো অশুভ সংবাদ শুনলে ‘ইন্নালিল্লাহ্’ বলতে হবে।

কোন কিছু হারিয়ে গেলে, কোন কিছু চুরি হয়ে গেলে, কেউ মারা গেলে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলতে হবে। অর্থ্যাৎ ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং তার কাছেই ফিরে যেতে হবে।” (১১) 

কথা প্রসঙ্গে কোনো গুনাহের কথা বলে ফেললে বা ভুলবশতঃ ছোট খাটো কোন গুনাহ্ করে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ্’ অর্থ্যাৎ ‘আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই’ বলার নির্দেশ আছে। (সুরাহ মুহাম্মদ, আয়াত : ১৯)

রাসূল ﷺ জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়ে ও প্রতিদিন সত্তর বারের ও অধিক বার ইস্তেগফার অর্থ্যাৎ ‘আস্তাগফিরুল্লাহ্’ পড়তেন। আর আমাদের মতো গুনাহ্গার বান্দাদের কত বেশিবার পড়া উচিত!

উপরে উঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলা এবং নীচে নামার সময় ‘সুবহানআল্লাহ্ বলা সুন্নত। (১২) 

নিশ্চিত ভাবে না জেনে কোনো বিষয়ে কিছু বললে, কথা শেষে ‘ওয়াল্লাহু আ’লাম‘ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহই ভালো জানেন’ বলা সুন্নত। (১৩)

কোন সমস্যা দেখা দিলে ‘তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ্‘ বলতে হবে। অর্থাৎ ‘আল্লাহর উপরই একমাত্র ভরসা।’

আনন্দদায়ক কিছু ঘটলে খুশিতে অত্যধিক হইচই না করে ‘ফা তাবারাকাল্লাহ্ বলতে হবে।

তেমনি ভাবে কোনকিছুতে ভয় পেলে চিৎকার, চেঁচামেচি না করে বলতে হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‘ অর্থ্যাৎ ‘মহান আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই।” (১৪)

কেউ ভালো কিছু দিলে কিংবা কারো মাধ্যমে কোনো কাজ হলে অর্থাৎ উপকৃত হলে তার জন্য ‘থ্যাংকস এ লট’ না বলে ‘জাযাকাল্লাহু খাইরান’ অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহ্ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন’ বলা সুন্নত। (১৫) 

অনেক অনেক ধন্যবাদ দিলাম। এটা আসলে কথার সৌন্দর্য। হয়তো শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু এ থেকে কোন বেনিফিট নেই, কোন কাজে আসবে না। কিন্তু ‘যাযাকাল্লাহু খাইরান’ বললে একটি সুন্দর দুআ করা হয় যাতে সে উপকৃত হবে ইন শা আল্লাহ্।

কোন কিছুতে বিজয় লাভ করলে কিংবা বিজয় লাভের আশায় শ্লোগান দিলে ‘আল্লাহু আকবর’ বলা সুন্নত। (১৬) আল্লাহু আকবর অর্থ্যাৎ ‘আল্লাহ সবচেয়ে মহান’ এটি ও একটি যিকির ও সাদাকা।

কারো কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় ‘বাই’ বা টেক কেয়ার’ না বলে বলুন – “আস সালামু আলাইকুম।” (১৭)

বিদায়ের সময় মুসাফাহা করুন। (১৮)

ইসলামে নির্দেশ আছে অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে চুপ করে থাকা উত্তম। রাসূল ﷺ বলেছেন – “যে আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান আনে সে যেন উত্তম কথা বলে কিংবা চুপ থাকে। (১৯)

অতএব – আসুন আমরা আমাদের কথা গুলোকে সুন্নতের সুন্দর আবরণে আচ্ছাদিত করি। আমাদের কথাগুলো যেন শুধু কথার কথাই না হয়; কথাগুলো যেন অলংকৃত হয়ে দুআ ও আখিরাতের পাথেয় অর্জনের ও মাধ্যম হতে পারে সে চেষ্টা করি।

ফুটনোটঃ

[১] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৫৩৭৬।
[২] ইবনে মাযাহ্, হাদিস নং ৩৮০৫।
[৩] তিরমিযী, হাদিস নং ৫/৪৬২, নং ৩৩৮৩। ইবন মাযাহ্‌, হাদিস নং ২।
[৪] সুনানে ইবনে মাযাহ্।
[৫] সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬২১৮।
[৬] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৬২১৮।
[৭] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৫০৮।
[৮] তিরমিযী, হাদিস নং ২৭৪১।
[৯] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৬২২৪।
[১০] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৬৩৬২।
[১১] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২১২৬।
[১২] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ২৯৯৩।
[১৩] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৫৫৭০।
[১৪] সহীহ বুখারী।
[১৫] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৬।
[১৬] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৬১০।[১৭] তিরমিযী, হাদীস নংং ২৭০৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নংং  ৫২০৮।
[১৮] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৪২; ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/৪৯১
[১৯] সহীহ বুখারি, হাদিস নং ১০২।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Donate

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.