প্লান – বি | Plan – B

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি-

Plan B

লেখক : শিহাব আহমেদ তুহিন

আমরা অনেক প্ল্যান নিয়ে কোনো কিছু করার চেষ্টা করি। plan-A কাজ না করলে Plan-B। আবার অনেক সময় এমন হয় – আমরা এ প্লাসের প্ল্যান নিয়ে এক্সাম হলে ঢুকি। কিন্তু প্রশ্ন পেয়ে মনে হয়ঃ ধুর! এ প্লাস! পাশ করে বেরুতে পারলে বাঁচি।

শয়তানও আল্লাহর প্রতিটা বান্দাকে নিয়ে এমন প্ল্যান নিয়ে অগ্রসর হয়। শুনতে অদ্ভুত শোনাবে কিন্তু কথাটা সত্যি। আমাদের সাথে শয়তানের পার্থক্য হলো, শয়তানের পরিকল্পনা অনেক দীর্ঘমেয়াদী আর কুশলী। আমাদেরকে ঘিরে শয়তানের পরিকল্পনা মোটা দাগে মোট ছয় প্রকারের। প্রথমটা বাস্তবায়ন না হলে সে দ্বিতীয়টা নিয়ে আগায়, দ্বিতীয়টা না হলে তৃতীয়টা…

এভাবে শয়তান কম্প্রোমাইজ করে। তার লক্ষ্যটাকে ছোট করে। কিন্তু এরপরেও তার লক্ষ্য থাকে যেন সে ছোট ছোট সে লক্ষ্যগুলো পূর্ণ করে আরো বড়ো কিছু হাসিল করতে পারে।

শিরক করানো :

শয়তানের প্রথম উদ্দেশ্য যাতে আল্লাহর বান্দারা মুশরিক হিসেবে মৃত্যুবরণ করে। মূর্তিপূজা করে। নানাভাবে সে মূর্তিপূজাকে আমাদের নিকট যুক্তিযুক্ত প্রমাণের চেষ্টা করে। কখনো সে আমাদের মনে এ বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয় যে, এই মূর্তিগুলো এমন কিছু সিফাত প্রাপ্ত যা কেবল আল্লাহর জন্যই স্বতন্ত্র।

আবার কখনো সে আমাদের বলার চেষ্টা করে, “তুমি তো মূর্তিগুলোকে পূজা করছো না। এগুলো আসলে আল্লাহর নিকট তোমার পৌঁছানোর মাধ্যম কেবল।” এভাবে শয়তান চায় আমরা যেন “লা ইলাহা ইল্লালাহ’ – কেই অস্বীকার করে বসি।
.
মূর্তিপূজায় সফল না হলে শয়তান চায় আমরা যেন অন্যভাবে শিরকে লিপ্ত হই। ঈমান আনার পরেও খাম্বা পূজা করি। শুভ-অশুভতে বিশ্বাস করি। কোমরে তাবীজ লটকাই। আল্লাহ বলেন,

“যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে, তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই (ঈমান আনার) সাথে সাথে শিরক করে।” (১১;১০৬)

আবার কখনো সে চায় আমরা যেন নিজের নফসের পূজা করি। অনুসরণ করি নিজের খেয়াল খুশির। যখন মন চায় আল্লাহর ইবাদত করবো। মন চাচ্ছে না, কিচ্ছু ভালো লাগছে না?- সব বাদ। কখনো নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে নিজেকে মুক্তমনা দাবী করে আল্লাহকেই আমরা অস্বীকার করে বসি। আল্লাহ বলেন,

“আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা করো না?” (৪৫;২৩)

আচ্ছা! শয়তান কেন চায় আমরা মুশরিক হিসাবে মারা যাই? যাতে জান্নাত আমাদের জন্য হারাম হয়ে যায়। জাহান্নামে আমরা তার সঙ্গী হয়ে যাই।

বিদ‘আত করানো :

শয়তান যখন আমাদের ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ – তে সমস্যা করতে পারে না তখন ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ তে সমস্যা সৃষ্টি করতে চায়। সে চায় আমরা মুহাম্মদ ﷺ এর পরিবর্তে অন্য কারো অনুসরণ করি। দুনিয়ার ফাসেক লোকদের আমাদের ‘রোলমডেল’ বানাই।

ইবাদত করলেও যাতে তার মধ্যে বিদআতকে মিশ্রিত করি। আর এর মাধ্যমে পুরো আমলটাই বরবাদ করি। নিজেকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাই। যাতে আমরা বিশ্বাস করি – মিলাদ করলে, চল্লিশা পড়লে মৃত ব্যক্তি নাজাত পায়। বছরে একটা দিন ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে শহীদের আত্না শান্তি পায়।

রাসূল ﷺ বলেন – ‘সকল বিদ‘আত পথভ্রষ্টতা। আর সকল পথভ্রষ্টকারী জাহান্নামী।’ এ কারণেই সুফিয়ান আস সওরী বলতেন, ‘অন্য যে কোনো পাপের চেয়ে শয়তানের কাছে বিদ‘আত প্রিয়।’

কাবীরাহ গুনাহ করানো :

শিরক আর বিদ‘আতের ফাঁদ পার হলে শয়তান চায় আমরা যেন বড়ো বড়ো গুনাহে লিপ্ত হই। ব্যভিচারে লিপ্ত হই, চুরি করি, প্রতারণা করি, সুদ খাই।

আমরা তো বড়ো গুনাহকারী বলতে কেবল “Public Sinners”- দের বুঝি। বাংলায় যাদের পতিতা বলে। ওরা কেন Public Sinner হবে? আমি বহু পতিতা মেয়ের গল্প পড়েছি যারা অসহায় অবস্থায় সেখানে আটকা পড়েছে। বের হবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। কেউ পেটের দায়ে এসেছে, কাউকে স্বামী কিংবা বাবা বিক্রি করে দিয়েছে। বুকের এক কোণে কি ঘৃণাটাই না আমরা তাদের জন্য জমা রাখি।

আচ্ছা! ওরা কি তাদের চেয়ে ঘৃণ্য যারা নিজের মায়ের সাথে জিনা করে (সুদ খায়)?

যারা গুনাহ করে আর শত শত মানুষকে সে দিকে আহ্বান করে। সেটা পেটের দায়ে নয়। নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণে, স্বস্তা কিছু জনপ্রিয়তার মোহে। এই উম্মাতের সকল মানুষকে মাফ করা হলেও যাদের মাফ করা হবে না। হাদীসে এটাকে মুজাহারা বলা হয়েছেন। উদাহারণ?

উদাহারণ হয়তো আপনি নিজেই। যদি আপনি হারাম গান শুনেন কিংবা গাইতে থাকেন, আর তারপর পুরো দুনিয়াকে তা দেখিয়ে বেড়ান। যদি আপনি হারাম রিলেশনে আবদ্ধ থাকেন আর তারপর “In a relationship” টাঙ্গিয়ে সবাইকে তা জানানোর ব্যবস্থা করেন।

সগীরা গুনাহ করানো :

ঈমানদারদের আক্রমণের জন্য সগীরা গুনাহ শয়তানের খুব প্রিয়। কারণ, একজন প্রকৃত ঈমানদেরকে যদি কেউ জিনাহ করতে বলে সে ভুলেও এই কাজ করবে না। তাকে যদি কেউ বলে তুমি মুসলিম ভাইদের উপর যুলুম করো, সে ভুলেও এই কাজ করবে না।

তাই শয়তান এসে বলে, “আচ্ছা ব্যভিচার করতে হবে না। এটা বড়ো খারাপ কাজ। তুমি হালকা চ্যাটিং করো। ফোনে কথা বলো। এগুলোতে তো সমস্যা নেই। ইসলাম কি এতোটা কঠোরতার কথা বলে?”

যুলুম করাতে না পারলে শয়তান চাইবে আমরা যাতে যুলুমের সাথে থাকি। সমর্থন দেই। কখনো তা ব্যক্তিগত স্বার্থে কখনো বা দলীয় স্বার্থে। আর এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জুলুমে শামিল হই। যেমনটা রাসূল ﷺ বলে গিয়েছেন – যখন পৃথিবীতে কোনো গুনাহ হয় তখন এর প্রেক্ষিতে দুই রকমের লোক থাকে।

এক রকমের লোক থাকে যারা গুনাহটা হতে দেখে। কিন্তু সেটা থামানোর সামর্থ্য তাদের নেই। তাই সেটা তারা অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। তাদের আমলনামায় লেখা হবে যেনো তারা গুনাহটি হতেই দেখেনি।

আরেক রকমের লোক থাকে যারা গুনাহ হতে দেখে না। কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তা সাপোর্ট করে। তাদের আমলনামায় গুনাহটা এমনভাবে লেখা হবে যেনো তারা নিজেই গুনাহটা করেছে।

কোনো মুসলিমাহকে দিয়ে ব্যভিচার করানো হয়তো শয়তানের পক্ষে খুব কঠিন। কিন্তু তাকেই পারফিউম ব্যবহার করিয়ে রাস্তায় নামানো আহামরি কঠিন না। রাসূল(সাঃ) এর হাদীস অনুসারে এর মাধ্যমে শয়তান তাকে ব্যভিচারীদের কাতারে ফালায়।

অর্থাৎ, আপাতদৃষ্টিতে যে পাপটা আমাদের নিকট হালকা মনে হয় সে পাপের মাধ্যমেই শয়তান আমাদের অনেক বড়ো গোমরাহীর দিকে নিয়ে যায়।

বনী ইসরাইলের বিখ্যাত আবেদ বারসিসার গল্প কে না জানে! যাকে শয়তান প্রথমে এক অসহায় মহিলার সাথে সামান্য যোগাযোগ করতে প্ররোচিত করিয়েছিলো। তারপর সেই মহিলার দ্বারাই তাকে ব্যভিচার করিয়েছিলো, মহিলার গর্ভে যে বাচ্চার জন্ম হয়েছিলো তাকে হত্যা করিয়েছিলো। হত্যা করিয়েছিলো মহিলাটিকেও। এতোটুকুতেই শয়তান ক্ষান্ত হয়নি। বারসিসাকে ভুলিয়ে শয়তানের সামনে সিজদা করিয়েছিলো। কিয়ামতের দিন বারসিসা শয়তানের জন্য সিজদা দিতে দিতে পুনরুত্থিত হবে।

আমল বরবাদ করানো :

যখন আমরা এসবকিছু থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে পারি তখন শয়তান চায় আমাদের আমলগুলোকে বরবাদ করতে। সালাতে দাঁড়ালেই শয়তান বিচিত্র সব চিন্তা-ভাবনা আমাদের মনে ঢুকিয়ে দেয়। কতোবার এমন হয়েছে আমরা কুর‘আন নিয়ে বসেছি আর একটুপর নিজেকে ফেইসবুকে আবিষ্কার করেছি?

আবার কখনো শয়তান চায় আমরা যাতে দুইটা আমলের মধ্যে কম উত্তম আমলটা করি। বহুদিন পর কুর‘আন পড়তে বসার পর হুট করে আমাদের মনে হয় অমুক ইসলামিক বইটা পড়া দরকার। তখন কুর‘আন পড়া বাদ দিয়ে আমরা ঐ বইটা পড়া শুরু করি। এর মাধ্যমে শয়তান আমাদের সবচেয়ে উত্তম নফল ইবাদত থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়।

শারীরিক ও মানসিক কষ্ট দেয়া :

সবগুলোতে ব্যর্থ হলে শয়তান চাইবে আমরা শারীরিক আর মানসিকভাবে কষ্ট পাই। আমাদের মন যাতে দুঃখ আর বিষাদে ভরে যায়। হতাশায় আবদ্ধ হয়ে নিজেকে অনেক ভালো কাজ থেকে বিরত রাখি।

আমরা অনেকেই মনে করি শয়তানের কারণেই তো আমরা এতো এতো গুনাহ করি। দায়ী হলে শয়তান হবে, আমি কেনো? উত্তর হচ্ছে- শয়তানকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সে আমাদের দেহের ধমনীতে রক্তের মতো চলাচল করতে পারে।

আর আমাদের দেয়া হয়েছে স্বাধীন ইচ্ছা। শয়তান হয়তো আমাকে ইন্টারনেটে হারাম কিছু দেখতে ওয়াসওয়াসা দিতে পারে।

কিন্তু আমি যদি নিজে ক্লিক না করি তার ক্ষমতা নেই আমাকে বাজে কোনো ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়ার। আমি যদি প্রতিটা কাজ বিস’মিল্লাহ দিয়ে শুরু করি, আয়াতুল কুরসী পড়ি, সূরা বাকারা পড়ি, বিরত থাকি মিথ্যা আর পাপ থেকে, শয়তানের ক্ষমতা নেই সে আমার উপর খবরদারি করবে। কারণ –

“শয়তান অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, পাপিষ্ঠের উপর।” (সূরাহ আশ’ শু’আরা ২৬;২২২)

যেই শয়তানের উপর আমরা দোষ চাপিয়ে দিতে চাই সেই শয়তান কিন্তু জাহান্নামে আমাদের কোনো দোষের ভার বহন করবে না। সে বোঝা ভার বহন করতে হবে আমাদের নিজেদেরকেই। হয়তো অনন্তকাল ধরেই।

“যখন সব কাজের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি, অতঃপর তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের উপর তো আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি, অতঃপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছো। কাজেই, তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না এবং নিজেদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্যকারী নই। এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্যকারী নও। ইতোপূর্বে তোমরা আমাকে যে আল্লাহর শরীক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করি। নিশ্চয় যারা জালেম তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা ইবরাহীম ১৪;২২)

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Donate

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.