সন্তান লালন-পালনের নিয়ম

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি-

Muslim Child

সন্তান লালন-পালনের নিয়ম সম্পর্কে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরি রহিমাহুল্লাহ’র দীর্ঘ আলোচনায় উল্লেখ করা কয়েকটি নিয়ম শেয়ার করছি। আগেই বলে রাখছি – শায়খ এখানে এমন কিছু নিয়মের উল্লেখ করেছেন, যা এখনকার অনেকে লোকই ধরতে পারবে না। কারো কারো কাছে সেটা বাড়াবাড়ি মনে হবে, অথচ বাস্তবে সেটা দ্বীন হেফাযতের সাথে সম্পর্কিত।

এখনকার অনেক লোক ধরতে পারবে না – কেন পারবে না সেটা ক্লিয়ার করার চেষ্টা করছি আগে..

একবার এক বিবাহিত ভাই আমাকে বিয়ের উৎসাহ দিতে গিয়ে বললেন – বিয়ের পর আপনার মা তো আর আপনার ওয়াইফকে নামায পড়তে বাঁধা দিবে না, ইসলাম মানতে বাঁধা কয়জন দেয়? সেই ভাইয়ের মতে ওয়াইফকে ইসলাম পালনে সাহায্য করা মানে জাস্ট তাকে সালাতে বাঁধা না দেওয়া। অথচ এই যুগে ওয়াইফকে পর্দার ভিতরে রাখতে গিয়ে একজন ছেলেকে, ছেলে না সরি, পুরুষকেও (সব ছেলেই পুরুষ না) প্রেসারে থাকতে হয় যেহেতু ফ্যামিলি পর্দার গুরুত্ব বুঝে না। আর এই যুগে তো দাইয়ুসদেরকেও দ্বীনদার বলা হয়!

আরেকবার একজন আমাকে বলেছিল – অমুক মাটির উপর বসে খায়, তাই অমুক গোঁয়ার। তার এমন কথা শুনে আবু যার গিফারি রদিয়াল্লাহু আনহু’র কথা আপনাদের মনে পড়তেই পারে। এই যুগে সুন্নাতের পাক্কা অনুসরণ করাটা অনেকের কাছে গোঁয়ারামি!

তো, উল্লেখ করা কয়েকটি নিয়ম ভাব ঠিক রেখে সাধুকে চলিত ভাষায় কনভার্ট করে নিজের ভাষায় আপনাদের সাথে শেয়ার করতে যাচ্ছি। প্রতিটি নিয়মের শেষে আমার নোট করা কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম –

১. বাচ্চাকে নেককার ও দ্বীনদার নারীর দুধপান করানো:

সন্তানের প্রথম হক হচ্ছে, পিতা তার সন্তানের জন্য দ্বীনদার মা নির্বাচন করবে। অর্থাৎ, আপনি যদি আপনার সন্তানের হক নষ্ট করতে না চান, বিয়ের আগেই আপনাকে একজন দ্বীনদার ও নেককার নারীকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে খুঁজার চেষ্টা করতে হবে, আর সেটা করতে হবে নিজে একজন দ্বীনদার হওয়ার চেষ্টা করার সাথে সাথেই।

যারা নিজে দ্বীনদার হওয়ার চেষ্টা না করেই দ্বীনদার স্ত্রী পাইতে চায়, তারা নিজেরা ফ্যান্টাসিতে আছে, দ্বীন পালন করতে গিয়ে মানব শয়তান আর জীন শয়তানের মুখোমুখি হয়ে একলা একলা লড়াই করার ইন্টেন্স রিয়েলিটি তারা ফেইস করে নাই। তারা মনে করে, দ্বীনদার স্ত্রী বিয়ে করতে পারলেই লাইফের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যে লোক মরার ভয়ে সংশোধন হয় না, সে লোকের মনে করা উচিত না দ্বীনদার স্ত্রী আমাকে ঠিক করতে পারবে। লাইফে সবকিছু নিজের ফ্যান্টাসি অনুসারে ঘটে না।

তাই এ রকম লোককে বিয়ে না করার বিষয়ে দ্বীনদার নারীদের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ এরা প্রেসারে পর আপনার দ্বীন পালনের ক্ষতি করতে পারে। আর অনেক ছেলে আছে, যারা দ্বীনদার মেয়ে খুঁজে একটা “ফ্রেশ মেয়ে” কে বিয়ের জন্য। আমি ছেলে মানুষ, ছেলে মানুষের ভিতরকার অনেক কথাই জানি।

সো ভাইয়েরা, আল্লাহ’র রাজ্যে আল্লাহ’র সাথে দুর্নীতি করার চেষ্টা কইরেন না। ইউ ক্যান্ট ডু ইট।

২. বাচ্চাদেরকে ভুত পেত্নির ভয় না দেখানো, এগুলোর ভয় দেখালে বাচ্চারা ভীতু হয়:

এমনকি এ.কে. ফজলুল হক এই বাস্তবতা বুঝেছিলেন। তার একটা কথা মনে পরসে – সন্তানকে বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছো, সে বাঘের সাথে লড়াই করা শিখবে কিভাবে?

দেশের মায়েরা অনেক অনেক টিচার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার, অনেক পেশার লোকের মা হয়েছে। কিত্নু আজ জাতির দরকার এমন মা, যারা আরেকজন টিপু সুলতানের মা হওয়ার নিয়্যতে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকবে। আর একজন শহিদের মা হওয়ার নিয়্যত থাকলে সন্তান আমাকে বড় হয়ে খাওয়াবে টাইপের চিন্তা ছেড়ে দেওয়া উচিত।

৩. মেয়েরা পর্দায় থাকতে অভ্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদেরকে অলংকার না পড়ানো:

একজন মেয়ে যখন নিজেকের আল্লাহ’র জন্য ঢেকে রাখার আগে নিজেকে প্রদর্শনের শিক্ষা পায়, তখন কি হয় সেটা আমাদের যাদের চোখ আছে, কান আছে তারা তো দেখছি আর শুনছিই।

৪. সন্তানদের চিৎকার করে কথা বলতে দিবেন না:

দাম্পত্য জীবনে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হলে সন্তানদের সামনে সেটা করবেন না, সন্তানরা আপনাদের থেকে সেটা শিখবে। এমন কিছু শিখাবেন না, যা আপনারা সন্তানদের কাছ থেকে রিটার্ন পেতে চাবেন।

৫. দ্বীনদার ও ভালো আদবের বাচ্চাদের সাথে ছাড়া অন্য কারো সাথে মিশতে না দেওয়া:

সঙ্গদোষে লোহা ভাসে। বি কেয়ারফুল! ছেলেধরাকে ভয় করেন, অথচ শয়তান আপনার সন্তানকে আল্লাহ’র রাস্তা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চায় – এটা ভয় করেন না ! কেমন মা / বাবা আপনি?

৬. কোন দোষ দেখলে বুঝিয়ে উপদেশ দিতে হবে, কোন ঘটনা শুনিয়ে দিতে হবে, এর মাধ্যমে অন্তরে ভালো স্বভাব ও মন্দ স্বভাবের ছবি অন্তরে এঁকে দিতে হবে। এক্ষেত্রে কুরআন, হাদিসের কাহিনী শুনানো বেস্ট ওয়ে:

বাচ্চাদেরকে পুস্টিকর খাবার খাওয়ানো যেমন ইম্পরট্যান্ট, তেমনি তাদেরকে কুরআন, হাদিসের ঘটনাগুলো তাদের বুঝার উপযোগী করে তাদের অন্তরে সেগুলোর দৃশ্য এঁকে দিয়ে তাদের অন্তরকে পরিপুষ্ট করাটা অনেক ইম্পরট্যান্ট। তাদের আত্মাগুলোকে মেরে ফেলিয়েন না। শরীরের সুস্থতার পাশাপাশি তাদের আত্মার সুস্থতা তীক্ষ্ণভাবে খেয়াল রাখার চেষ্টা করবেন।

৭. সাত বছর থেকেই নামাযের অভ্যাস করানো:

যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, চলো সেই আল্লাহ’র সামনে দাড়াই – এরকম কিছু কথা বাচ্চাদের অন্তরে ডিপ ইনফ্লুয়েন্স রাখে। ইমাম গাযযালি তার কিমিয়ায়ে সাআদাতে এরকম একটা ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন যে, একটা বাচ্চাকে শিখানো হয়েছিলে রাতে ঘুমানোর আগে সে যেন চিন্তা করে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। সে এভাবে চিন্তা করতে করতে তার মনে এর একটা ইনফ্লুয়েন্স ক্রিয়েইট হতো, সে কোন পাপ করতে গেলেই সেই চিন্তা তার সামনে চলে আসতো।

৮. ছোটবেলা থেকেই নিয়মানুবর্তিতা শিখানো:

সময়ের মূল্য মার্কা আজাইরা কিছু শিখার বিষয়ে আমি নিজেই এখন আফসোস করি। সময়ের মূল্য রচনা শিখার চেয়ে সূরাহ আল আসরের শিক্ষা খুব সহজে বুঝিয়ে দিয়ে একজন সন্তানের অন্তরে আপনি ম্যাচিউরিটি দিতে পারেন, মহামূল্যবান সম্পদ দিতে পারেন, যেটা তার বাকিজীবন শয়তানের সাথে লড়াই করে আল্লাহ’র রাস্তায় টিকে থাকার বিষয়ে তার কাজে লাগবে।

৯. নাটক সিনেমা দেখা, উল্টাপাল্টা গল্প কাহিনী পড়া ইত্যাদি থেকে দূরে রাখা:

ঘরে নিউজপেপার, ম্যাগাজিন রাখবেন না, যেগুলোতে অনর্থক কিছু থাকে, সেই অনর্থক কিছু হতে পারে মেয়েদের ছবিওয়ালা কিছু, সতর বের হয়ে থাকা কোন ছবিওয়ালা কিছু, খেলার ম্যাগাজিন ইত্যাদি। মোটকথা এমন কিছু ঘরে না রাখা, যা তাদের আখিরাতের জীবনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

১০. খেলনা বাদ্যযন্ত্র কিনে না দেওয়া:

বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ছোট থেকেই ঘৃণা করা শিখাবেন।

১১. নিজ হাতে কাজ করানোর অভ্যাস করানো:

আপনার সন্তানকে প্রতিবন্ধী বানাবেন না।

১২. আদব কায়দা শিখানো:

আগে আপনাকে আদব কায়দা জানতে হবে। কারণ সন্তানেরা দেখে দেখে শিখে।

আপনি সন্তানের পিতা। আপনার ওয়াইফের মাথায় সন্তানকে দেখিয়ে দেখিয়ে হাত বুলিয়ে দেন। সন্তান এক সময় তার মাকে এভাবে আদর করবে।

আপনি সন্তানের মা। সন্তানের সামনে আপনার স্বামীর একান্ত আনুগত্য করেন, রেস্পেক্ট করেন, আপনার সন্তান তার পিতাকে সেভাবে রেস্পেক্ট করা শিখবে।

নিজেদের মধ্যে কোন প্রবলেম হলে সন্তানের সামনে ভুলেও প্রকাশ করবেন না।

পরিশেষে, প্রকৃত শিস্টাচার হচ্ছে আল্লাহ’র সাথে শিষ্টাচার। আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা মানতে না পারলে আপনি মানুষের কাছে যতোই ভদ্র হোন না কেন, বাস্তবে আপনি অভদ্র। আপনি লোকদের সামনে খুব স্মার্টলি কথা বলেন, মনোযোগ দিয়ে কথা বলেন আর শুনেন, কিন্তু আল্লাহ’র সামনে সালাতে দাঁড়ালে আপনি স্মার্টলি কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন না, আল্লাহ ছাড়া অন্যদিকে মনোযোগ দেন, আপনি মানুষের কাছে ভদ্র হলে কি হবে, অন্যদিকে যে নিজের রবের সাথেই অভদ্রতা করছেন !

তাই সন্তানের জন্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা – তোমার আম্মাকে কে সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ। তোমার আব্বাকে কে সৃষ্টি করেছেন ? আল্লাহ। সেই আল্লাহ’র সাথে কি তুমি বেআদবি করবে? সন্তানকে আল্লাহ’র সাথে শিষ্টাচারের শিক্ষা দিতে হবে।

জমি উর্বর থাকা অবস্থায় (ফিতরত ঠিক থাকা অবস্থায়) তাকওয়ার বীজ বুনে দেন সন্তানের অন্তরে। শয়তান থেকে হেফাযতের চেষ্টা করে যান। আল্লাহ আপনাকে যে আমানত দিয়েছেন, সেই আমানতের খেয়ানত করিয়েন না।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Donate

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.