মুহাম্মদ হলো ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি-

Muhammad

লেখক : রাজিব হাসান

“মুহাম্মদ হলো ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক”…

পাঠ্যপুস্তকসহ আরো অনেক বই-য়ে এই কথাটি দৃষ্টিগোচর হয়। বাম-রাম, মুখার্জি-ব্যানার্জিসহ শুনে শুনে গজিয়ে ওঠা চুপানাস্তিকবর্গের মুখে পপকর্ণের মত ফুট ফুট করে উঠতে থাকে এই অগভীর ও অপরিপক্ব কথাটি।

তারা বলে থাকে মক্কায় তো অনেক আগে থেকেই মূর্তিপূজার প্রচলন ছিলো। হঠাৎ করেই মুসলমানদের নবী মুহাম্মাদ এসে নতুন করে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন করে। তাদের মুখ থেকে এরকম প্রলাপও বেরিয়ে আসে যে সনাতন ধর্ম এসেছে সবার আগে এরপর বাকী ধর্মগুলি।

শুধু তাই নয়, সোনামণিদের পাঠ্যপুস্তকেও বড় করে লেখা দেখেছিলাম “(ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মুহাম্মাদ)।”

আল্লামা আলবানী (রহ.) তার এক গ্রন্থে তথ্যবহুল চমৎকার সব আলোচনা এনেছেন। মূর্তিপূজা কীভাবে এলো, কিভাবে প্রসার পেল, কীভাবে তা ছড়িয়ে গেলো ভাইরাসের মত। আজ সেই গ্রন্থ থেকেই কিছু আলোচনা আনা যাক বি-ইযনিল্লাহ।

তিনি (রহ.) বলেন, শারিয়াহ প্রতিষ্ঠিত হবার প্রাক্কালে – একদম শুরুর দিকে – জাতি ছিল মাত্র একটা।নির্ভেজাল তাওহীদ তথা একত্ববাদের উপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল তদ্বকালীন মানবজাতি। এরপর ধীরে ধীরে শিরক তাদেরকে ঘিরে ধরল। আর এর দালিলিক ভিত্তি হলো আল্লাহ আযযা ওয়াযাল ইরশাদ করেন,

“সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে।”[ক্বুর’আন: ০০২:২১৩]

শিরক কী?

এই প্রশ্নের উত্তরে আল্লামা আলবানী (রহ.) বলেন, আল্লাহ’কে বাদ দিয়ে গাইরুল্লাহর ইবাদাত করা আল্লাহ’র যে কোন হক্বে কাউকে অংশীদার সাবস্ত্য করা।

ইবনে আব্বাস (রা:) বলেছেন, আদম (আ:) থেকে নূহ (আ:) পর্যন্ত ছিল দশ প্রজন্ম। তাদের সবাই ছিল শারিয়াহ’র সুপ্রতিষ্ঠিত তাওহীদের পথে। এরপর তারা বিচ্ছিন হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ্‌ আম্বিয়া কিরামগণ (আলাইহিমুস সালাম) – কে প্রেরণ করেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরুপে। [তাফসীরে ইবনে জারীর (৪/২৭৫) ও আল হাকীম (২/৫৪৬)

রাসূল (সা:) বলেছেন আল্লাহ্‌ বলেন,

“আমি আমার সকল বান্দাদেরকে সত্য ধর্মের উপরে সৃষ্টি করেছি (শিরকমুক্ত তৌহিদের উপর)। অত:পর তাদের কাছে শাইত্বন এলো, সত্য ধর্ম থেকে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিল। আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছি তারা লোকদের কাছে তা হারাম করে দিল এবং তাদেরকে আমার ইবাদতে অংশীদার স্থাপন করার নির্দেশ দিল, যার কোন দলিল আমি তাদের কাছে প্রেরণ করিনি।” (সহিহ মুসলিম:, ৮/১৫৯, আহমাদ: (৪/১৬২)

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন, “প্রতিটি নবজাতক ফিতরাতের উপর জম্মগ্রহণ করে। এরপর তার পিতামাতা তাকে ইয়াহুদী বানায়, খ্রীস্টান বানায় এবং অগ্নিপূজক বানায়, যেমন চতুষ্পদ জানোয়ার পূর্ণাঙ্গ চতুষ্পদ বাচ্চা প্রসব করে। তোমরা কি তাতে কোন কর্তিত অঙ্গ (বাচ্চা) দেখ?” (সহিহ মুসলিম, তাক্বদির অধ্যায়, হা: ৬৫১৪)

আল্লাহ বলেন,

“এটাই আল্লাহ’র প্রকৃতি, যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ’র সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” (কুর’আন: ৩০:৩০)

প্রথম জাতি যারা জমিনের উপর সবচাইতে বড় জুলুম (শিরক) শুরু করেছিল :

এই সুস্পষ্ট বিবরণীর পর, মুসলিমজাতির এটাও জানা অতীব জরূরী যে, মুউয়াহিদীন তথা তৌহিদের উপর অবিচল থাকা ক্বওম থাকার পরও কিভাবে ঈমানদারদের মধ্যে শিরক ছড়িয়ে পড়েছিল। আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) সর্বপ্রথম প্রেরিত রাসূল নূহ (আঃ) -এর জাতি সম্পর্কে যা জানিয়েছেন আমাদেরকে, তা হলো তিনি তাকে প্রেরণ করেছিলেন শিরকের মত সবচাইতে গর্হিত ও গুনাহের কাজ বন্ধ করার এবং মানুষকে সত্যের দিকে আহবান ও তাওহীদের দিকে ফিরে আনার জন্য।

“তারা বলছে, তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সূয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নসরকে।” (ক্বুর’আন ৭১:২৩)

[বিভিন্ন সহিহ বর্ণনায় সালাফদের অভিমত পাওয়া যায় যে, এই পাঁচ দেবতা তাদের জীবদ্দশায় ছিল সৎকর্মপরায়ণ মুত্তাক্বী বান্দা। অত:পর যখন তারা মারা যায় তখন শাইত্বন লোকজনের মধ্যে গুজব ছড়ায় তাদের পশ্চাদপসরণ করার আর তাদের ক্ববরের পাশে বসে থাকার জন্য]

এরপর শাইত্বন পরবর্তী প্রজন্ম আসলে তাদের মধ্যে গুজব ছড়াল যে, তাদের উচিৎ মৃত সেই পাঁচজন ব্যক্তির ছবি আর মূর্তি বানানো।

এই ধ্যান – ধারণা শাইত্বন তাদের সামনে সুশোভিত করে তুলে ধরল যাতে তারা তাদেরকে মনে রাখতে পারে আর তাদের সঠিক ও সুন্দরভাবে অনুসরণ করতে পারে।

অতঃপর আসল ৩য় প্রজন্ম। শাইত্বন তাদেরকে ২য় প্রজন্মের রেখে যাওয়া ছবি-মূর্তিগুলিকে আল্লাহ – সর্বশক্তিমানের ইবাদাতের পাশপাশি পূজা করতে বলল।

আর সে তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল যে, এই কাজ তাদের বাপ-দাদারাও করত। অত:পর আল্লাহ নূহ (আ:) – কে পাঠালেন, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, শুধুমাত্র এক আল্লাহ’র ইবাদত করার জন্য। হাতে গোণা কয়েকজন লোক ছাড়া তার ডাকে আর কেউ সারা দিল না। মহান আল্লাহ সূরা নূহ-এর মধ্যে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “নি:সন্দেহে এই পাঁচজন ব্যক্তি ছিল নূহ (আ:)-এর ক্বওমের পরহেজগার ব্যক্তি। যখন তারা মৃত্যুবরণ করে শাইত্বন তাদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেয়। যাতে তারা তাদের মূর্তি বানায়। আর সেগুলি লোকালয়ে স্থাপন করার কুমন্ত্রণা দেয়। অত:পর তারা তাই করে। তবে, তাদের মধ্যে থেকে তখনকার কেউই মূর্তিগুলির পূজা করা শুরু করেনি। বরং তারা মারা যাবার পর এই মুর্তিগুলির ব্যাপারে মানুষ ভুলেই ছিল কিছুকাল। অত:পর এর পরের প্রজন্ম মূর্তিপূজা শুরু করে।” (বুখারী: ৮/৫৩৪)।

ঠিক একইরকম বর্ণনা পাওয়া যায় ইবনে জারীর, আত-তাবারী, অন্যান্য সালাফগণের বর্ণনায়। (আদ-দাররুল মানছুর -৬/২৬৯)

গায়রুল্লাহর ইবাদত হিসেবে প্রথম মুর্তি-পূজা শুরু যেভাবে :

ওয়াদ্দ ছিলেন সৎ, ধার্মিক, ঈমানদার আর একনিষ্ঠ আল্লাহ’র ইবাদতকারী। তাকে তার জাতির লোকজন খুব ভালোবাসত। উনার ইন্তেকালের পর লোকেরা বাবেল শহরে উনার কবরের পাশে জমায়েত হতে লাগল। শোকের মাতম ও বিলাপ প্রকাশ করতে আরম্ভ করল। অত:পর শাইত্বন যখন দেখল, লোকেরা কবর কেন্দ্রিক শোক ও বিলাপ প্রকাশ করছে তখন সে একজন মানুষের রুপে তাদের কাছে আসল আর বলতে লাগল,

আমি দেখলাম তোমরা তার কবরের পাশে শোকের মাতম করছ! তাহলে কেন তোমরা তার ছবি বানাচ্ছ না? (অর্থাৎ মূর্তি)। কেন তোমরা নিজেদের স্ব স্ব লোকালয়ে স্থাপন করছ না – যাতে তোমার তাকে স্মরণে রাখতে পার? তারা প্রলুব্ধ হয়ে শাইত্বনের এহেন ধোঁকায় ‘সায়’ দিল। এরপর তারা তাদের মূর্তি বানালো আর তাদের লোকালয়ে স্থাপন করল। যাতে তারা তাকে মনে রাখতে পারে।

যখন শাইত্বন তাদেরকে দেখল যে, তারা (মাত্রাতিরিক্ত ভাবে) ওয়াদ্দকে স্মরণ করছে, তখন সে বলল: আচ্ছা? কেন তোমরা সকলেই একটি করে মূর্তি তোমাদের নিজ নিজ ঘরের জন্য বানিয়ে নিচ্ছ না? এতে করে খুব সহজেই তাকে তোমরা স্মরণে রাখতে পারবে। অত:পর তারা তাতেও ‘সায়’ দিল।

ফলশ্রুতিতে প্রতিটি ঘরে তাদের মূর্তি তৈরী হলো, এটাকে তারা যত্ন করত, শ্রদ্ধা করত, আর এটা তাদেরকে তার স্মৃতি মনে করিয়ে দিত।

আবু জা’ফর বলেছেন, পরবর্তী প্রজন্ম যখন দেখল এটা তাদের বাপ-দাদারা করে গেছেন, তখন এটাকে এই প্রজন্ম ইবাদতযোগ্য ইলাহ (দেবতা) ভাবতে শুরু করে দিল।

তিনি আরো বলেন,

“এটাই হলো প্রথম আল্লাহর ইবাদত বাদ দিয়ে ১ম মূর্তি পূজা। তারা এই মূর্তির নাম দিয়েছিল ‘ওয়াদ্দ’।” (ইবনে আবু হাতিম)।

কার্যত : আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) – এর প্রজ্ঞা প্রকাশিত হয়েছিল, যখন তিনি নাবী মুহম্মদ (সা:) – কে সর্বশেষ নাবী হিসেবে এবং শারিয়াহ’র বিধানকে শাশ্বত বিধান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

যে বিধানের মাধ্যমে সুমহান রব নির্জলা শিরক এবং শিরকের উৎপত্তিস্থলজনিত সকল পথ ও ঘাটের উপর সম্পূর্ণরুপে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিয়েছেন। (কবরকেন্দ্রিক মাতম, ছবি, মূর্তি বানানো ইত্যাদি)। মানুষ যেন শিরকের মত গুরুতর গুনাহের ফাঁদে ফের জড়িয়ে না পরে।

এই কারণে কবর পাকা করা, বিশেষ উদ্দেশ্যে সেখানে ভ্রমণ করা, মাজারকে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র বানানো, সেখানে জমায়েত হওয়া, কবরবাসীর নামে মান্নত করা, তাদের কাছে কিছু চাওয়া – এসব কিছুই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এগুলি শিরকের দিকে ধাবিত করে, সুমহান রবকে ফেলে গাইরুল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে যায়।

ঘটনা হলো এই বা এর চাইতে আরো ভয়াবহ যে এমন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে ইলমের বিলুপ্তি ঘটছে, জাহালাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতি অল্প-সংখ্যক দিক-নির্দেশনা দেবার মত আলিম (সত্যের দিকে আহবানে) পাওয়া যাচ্ছে।

সেই সাথে শাইত্বন মানুষ আর জ্বিনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার নিমিত্তে কাজ করে যাচ্ছে। আল্লাহর তা’য়ালার একক ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র :

গ্রন্থকার : আল্লাম্মা মুহাম্মাদ নাসির-উদ-দীন আল-আলবানী (রহ.)

গ্রন্থ : তাহধিরুস-সাজিদ মিন ইত্তিখাদিল কুবুরি মাসাজিদ, পৃষ্ঠা:১০১-১০৬, (ঈষৎ পরিমার্জিত)।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Donate

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.