তর্ক বান্দার অন্তর থেকে ইলমের নূর ছিনিয়ে নেয়

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি-

Argue

লেখক : শিহাব আহমেদ তুহিন

একজন শায়খ বলেছিলেন – আমাদের জীবন অনেকটা বাজারের মত। এখানে নানান মতের, বর্ণের, স্বভাবের মানুষের সাথে আমাদের দেখা হয়। সবার কাছ থেকে আমরা একই আচরণ পাই না। কেউ রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরেও আমাদের সাথে বেশ আদ্র আচরণ করে, আবার কেউ কোনো কারণ ছাড়াই প্রকাশ করে ভয়ঙ্কর বিদ্বেষ। মানুষের আচরণ আমাদের অন্তরকে প্রভাবিত করে সন্দেহ নেই, তবে যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা তারা কিন্তু এসবে মোটেও প্রভাবিত হয় না।

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) লিখেছেন –

“যখন কেউ তার রবের প্রতি আনুগত্যের চূড়ায় পৌঁছায়, আর সেখানেই অটল থাকে, তখন মানুষের প্রশংসা কিংবা সমালোচনা নিয়ে তার কোনো মাথা-ব্যাথা থাকে না। মানুষ প্রশংসা করলে সে খুশি হয় না। আবার সমালোচনা করলে সে হতাশও হয়ে যায় না।” [1]

এ কারণে দ্বীন নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অবশ্যই কে কী বলল তা ইগনোর করতে শেখা উচিত। হ্যাঁ, গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত। তবে শুধু প্রশংসা-সমালোচনার বৃত্তে নিজেকে আবদ্ধ রাখলে তখন আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে কাজ করতে পারে না। তার কাজগুলো মানুষের ইচ্ছানুযায়ী আবর্তিত হয়।

বিশেষ করে ফেইসবুক এখন আমাদের জীবনের মতই একটা মার্কেটপ্লেস হয়ে গিয়েছে। এখানে নানা আকিদা, মানহাজ, মাযহাব-এর লোকজন আছে। ব্যক্তি হিসেবে আমারও নির্দিষ্ট আকিদা-মানহাজ রয়েছে। আমি যদি আল্লাহ তা’আলার সিফাত নিয়ে লিখি, অনেক কিছুতেই যারা আশআরি-মাতুরিদি আকিদা রাখেন, তারা একমত হবেন না। আর সবাই সবকিছুতে একমত হবে এমনটা আশা করাও উচিত না। তবে একটু সহনশীলতা তো আশা করাই যায়।

কিন্তু দু:খজনকভাবে সে সহনশীলতার ছিটেফোঁটাও দ্বীনি প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায় না। উদ্ভট ভাষার প্রয়োগ থেকে শুরু করে মিথ্যা অপবাদ দিতেও তারা একটুও ভয় করেন না। তারপর ইনবক্স-কমেন্টবক্সে চলতে থাকে মেসেজের পর মেসেজ, কমেন্টের পর কমেন্ট। তর্কে যোগ দিলে বৃথা কিছু সময় অপচয় হয়, বাড়ে তিক্ততা। আর না দিলে পেতে হয় অহংকারী তকমা।

রাসূল ﷺ বলেছেন,

مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى إِلَّا أُوتُوا الْجَدَلَ

“কোনো কওম-ই হিদায়াত পাবার পরেও পথভ্রষ্ট হয় না অতিরিক্ত তর্ক করা ছাড়া।” [1]

মারুফ আল কারখি (রহ.) বলেন –

“যখন আল্লাহ তাঁর বান্দার ভালো চান তখন তিনি তার জন্যে আমলের দরজা খুলে দেন আর তর্কের দরজা বন্ধ করে দেন। আর যখন আল্লাহ তা না চান, তখন তিনি তার জন্যে তর্কের দরজা খুলে দেন আর আমলের দরজা বন্ধ করে দেন।” [3]

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন,

المراء والجدال في العلم يذهب بنور العلم من قلب العبد

“তর্ক বান্দার অন্তর থেকে ‘ইলমের নূর ছিনিয়ে নেয়।”

তাই অহংকার থেকে নয় বরং এ বিষয়গুলোকে ভয় করেই সেই মেসেজ ও কমেন্টের কোনো রিপ্লাই না দিতে চেষ্টা করি। আশা করি, আমার ভাইয়েরা তাদের এই পাপী ভাইয়ের ওপর রহম করবেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করেছি কেউ কেউ বলেছেন – এসব লেখালিখি নাকি পুরোটাই টাকা কামানোর ধান্দা।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না, যারা দ্বীন নিয়ে লেখালিখি করে অর্থ উপার্জন করছেন, তারা খারাপ কিছু করছেন। বরং প্রফেশনাল লেখক-অনুবাদক পেতে হলে আমাদের প্রকাশনা জগতে অর্থ ব্যয়ের মানসিকতা আরো উদার করা উচিত।

তবে আমি এখানে কেবল আমার কথা বলছি। প্রথম যখন লেখালিখি শুরু করি, তখন অনেকেই এটা ভালোভাবে নেয়নি। আত্মীয়স্বজন, ক্লাসমেট থেকে শুরু করে এমনকি দ্বীনি ভাইয়েরাও না। তারপরেও দুটো কারণে লেখালিখি কন্টিনিউ করে গিয়েছি।

প্রথমত, এটা বেশ ইফেক্টিভ দাওয়াহ দেয়ার মাধ্যম। দ্বিতীয়ত, লিখতে গেলে অনেক পড়তে হয়। ফলে অনেক কিছু জানাও হয়। তাছাড়া লেখালিখি অনেক সময় আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। একটা গুনাহের ব্যাপারে লেখার পর যখন সেই গুনাহটাই আমার সামনে আসে, তখন মন বলে,

“সবাইকে গুনাহের ব্যাপারে সাবধান করার পর তুমি নিজেই যদি এই গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাও, তবে আল্লাহর নিকট তা কেমন দেখাবে বলো তো?”

প্রথম লেখালিখির সময় কখনো স্বপ্নেও চিন্তা করিনি এসব বইয়ের রূপ পাবে। পরবর্তীতে আল্লাহর সহয়তায় আর প্রকাশকদের আগ্রহের কারণে এসব লেখা বইয়ের রূপ পেয়েছে। এখন পর্যন্ত সমর্পণ, সমকালীন আর সিরাত পাবলিকেশন্স থেকে আমরা লেখা বের হয়েছে। কারো জানার ইচ্ছা থাকলে এই প্রকাশনাগুলো থেকে জেনে নিতে পারেন আমি লেখালিখি করে কতো অর্থ উপার্জন করেছি! ঠিক কতোটুকু দ্বীন বেঁচে আমার দিন গিয়েছে!

হ্যাঁ কিছু বিষয় আপনারা প্রকাশকদের কাছ থেকে জানতে পারবেন না। আমার কষ্ট, অশ্রু, বিনিদ্র রজনী। সেগুলো আপনাদের জানার প্রয়োজনও নেই। আমার রব জানলেই চলবে।

বাকী থেকে খ্যাতি আর মানুষের প্রশংসা লাভের বিষয়টা। এটা এমন এক ব্যাপার যেটার সাথে আমি নিয়াতকে বিশুদ্ধ করার জন্যে সবসময় যুদ্ধ করার চেষ্টা করি। সবসময় সফল যে হই এমনও না। কেবল আল্লাহ তা’আলাই জানেন অন্তরের খবর।

পাশাপাশি আমি সবসময়ই বলে এসেছি, কেউ যেন ফেইসবুক দিয়ে আমায় বিচার না করেন। আমি ধর্ম নিয়ে লিখি বলে বাস্তবে আমি মোটেও আহামরি ধার্মিক নই।

বরং, অনেকক্ষেত্রে অনেক এভারেজ মুসলিম থেকেও আমি নীচে রয়েছি। এই নীল জগত ব্যক্তি লেখক সম্পর্কে যে ধারণা আপনাদের মনে বদ্ধমূল করে দেয়, বাস্তবতা তা থেকে একেবারেই আলাদা।

আমি একদম সাধারণ একজন মানুষ। দেখতে সাধারণ। কথা বলিও সাধারণভাবে। আমার চলাফেরা, পোশাক সবই সাধারণ। যখন দ্বীনের বুঝ ছিল না, আমাকে নিয়ে এত আগ্রহ মানুষের মধ্যে দেখতাম না।

কোনো মেয়ে একবার আমাকে দেখলে দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখবে এমন চেহারাও আমার ছিল না, এখনো নেই। কিন্তু দ্বীন নিয়ে লেখালিখি শুরুর পর আবিষ্কার করলাম, মানুষ শুধু লেখালিখির কারণেই ব্যক্তি আমার প্রতি একটা মিথ্যা ধারণা তৈরি করে বসে আছে।

অনেকে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুধু ফেইসবুক দেখেই নিয়ে ফেলেন। কিন্তু কে বলেছে ফেইসবুক আর রিয়েললাইফ এক হবে? ফেইসবুকে যার লেখা দেখে তাকে আপনারা অনেক জ্ঞানী মানুষ মনে করছেন, বাস্তবে সে ।একজন তালিবুল ইলমও না। আর প্রাক্টিসং লেভেলে অনেক ক্ষেত্রেই বিলো এভারেজ।

প্রিয় দ্বীনি ভাই-বোনেরা! আমার ওপর রহম করুন। আপনাদের কারণে আমি যা না সেটার জন্যে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে চাই না।

গুনাহের পাল্লা এমনিতেই অনেক ভারী!

[1] মাদারিজুস সালেকীন, ২/৮।
[2] শুয়াবুল ঈমান, হাদিস নং ৮০৮০।
[3] হিলিয়াতুল আওলিয়া, ৮/৩৬১।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

Donate

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.